ডা: গুলজার হোসেন উজ্জ্বল, রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ

 

আমাদের দেশে ব্লাড ট্রান্সফিউশন বা রক্ত পরিসঞ্চালন বিষয়টাকে খুব হালকাভাবে দেখা হয়। দেশে হেমাটোলজিস্ট ও ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিশেষজ্ঞর সংখ্যা খুব কম হওয়ায় এ সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের জ্ঞানচর্চাও কম। রোগীরা নানাভাবেই বঞ্চিত হচ্ছেন। ভুল চিকিৎসারও শিকার হচ্ছেন।

প্রায় প্রতিদিনই অপ্রয়োজনীয় রক্ত পরিসঞ্চালনের ঘটনা দেখতে পাই। আয়রন ডেফিসিয়েন্সির ক্ষেত্রে এই অপ্রয়োজনীয় রক্ত পরিসঞ্চালনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি। থ্যালাসেমিয়া ট্রেইটের ক্ষেত্রেও পাওয়া যায়। অধিকাংশ আয়রন ডেফিসিয়েন্সিতেই রক্ত পরিসঞ্চালনের প্রয়োজন হয়না। কিন্তু দেওয়া হয়। হিমোগ্লোবিন দশের নিচে নামলেই আমরা রক্ত দিতে আগ্রহী হয়ে উঠি।

অনেক ক্ষেত্রে ঠিকভাবে রোগনির্ণয়ও করা হয়না। হিমোগ্লোবিন কম দেখলেই রক্ত দিয়ে দেওয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে পরবর্তীতে রোগ নির্ণয় করা কিছুটা জটিল হয়ে পড়ে। গর্ভাবস্থায় আয়রনের ঘাটতি জনিত রক্তস্বল্পতা খুবই কমন। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আয়রন সাপ্লিমেন্ট দিলে দ্রুত কারেকশন হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় আমাদের দেশে এরকম রোগীদের ক্ষেত্রে রক্ত পরিসঞ্চালনের হার আশংকাজনক ভাবে বেশি।

আয়রন সাপ্লিমেন্টের ক্ষেত্রেও ম্যালট্রিটমেন্টের নজির প্রচুর৷ মুখে খেলেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে আয়রনের ঘাটতি পূরন হয়ে যায়। বিশেষ কিছু ক্ষেত্র ব্যাতীত ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে আয়রন দেওয়া আর মুখে আয়রনের ট্যাবলেট/ ক্যাপসুল দেওয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য থাকেনা। ফল প্রায় একই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় একটু বেশি ঘাটতি দেখলেই আয়রন ইঞ্জেকশন দেওয়ার প্রবণতা কাজ করে।

আমাদের ডাক্তারদের মধ্যেই শুধু না রোগীদের মধ্যেও এ জাতীয় প্রবণতা কাজ করে। হিমোগ্লোবিন কম দেখলে অনেক ক্ষেত্রে রোগীরাও অস্থির হয়ে উঠেন রক্ত নেবার জন্য। গত সপ্তাহে এক রোগীকে দেখেছিলাম হিমোগ্লোবিন ৭.৫। ওষুধ দিয়েছিলাম। বলেছি তিন সপ্তাহে পুরন হয়ে যাবে আশা করি। আজ দেখা করতে এসে বলল নিজেরাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে গিয়ে দুই ব্যাগ রক্ত ভরেছে। রক্ত ভরতে পেরে রোগী এবং রোগীর লোক দুজনেই আনন্দিত। তাদের কাছে এটা অনেকটা পথ্যের মত। ডাক্তার সাহেবের অনুমতির দরকার নেই।

শুনতে একটু বেশি মনে হলেও সত্যিকার অর্থে রক্ত পরিসঞ্চালন অংগ প্রতিস্থাপনের মতই একটি ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া। এক ব্যাগ রক্ত শরীরে নেবার আগে অন্তত দশবার ভাবা জরুরি।

নিচে রক্ত পরিসঞ্চালনের একটি গাইডলাইন দিলাম। ডাক্তার সাহেবদের জন্যই মূলত দেওয়া। সাধারণ মানুষও চেষ্টা করলে বুঝতে পারবেন। এখানে দেখবেন হিমোগ্লোবিন ছয়ের নিচে গেলেই কেবল নিশ্চিতভাবে রক্ত দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। ৬ এর উপরে গেলেই শর্ত আরোপ করা হয়েছে।